get-out-of-depression


দুশ্চিন্তা বা হতাশা বর্তমানে আমাদের কাছে একটা কমন বিষয় হয়ে পড়েছে বিশেষ করে যুবক-যুবতি থেকে শুরু করে সবারই কম বেশি দুশ্চিন্তা বা হতাশা গ্রাস করে। “নিশ্চয় মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে অস্থির-চিত্তরূপে” [সূরা ৭০/ মা’আরিজ - ১৯]

এই অস্থিরচিত্ত মনকে স্থির করার জন্যে আল্লাহ তায়ালা বলেন –

تَعْرُجُ ٱلْمَلَـٰٓئِكَةُ وَٱلرُّوحُ إِلَيْهِ فِى يَوْمٍۢ كَانَ مِقْدَارُهُۥ خَمْسِينَ أَلْفَ سَنَةٍۢ . فَٱصْبِرْ صَبْرًۭا جَمِيلًا

“ফেরেশতাগণ এবং রূহ আল্লাহ তা’আলার দিকে ঊর্ধ্বগামী হয় এমন একদিনে, যার পরিমাণ পঞ্চাশ হাজার বছর। সুতরাং, তুমি ধৈর্য ধারণ কর, পরম ধৈর্য।” [সূরা ৭০/মা’আরিজ – ৪, ৫ ] 

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে যার বেশিরভাগই প্রমাণ মেলে। আর এই দুশ্চিন্তা বা ডিপ্রেশন থেকে অনেকে আবার আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। কি ভয়ঙ্কর! দুশ্চিন্তার কারণে আমাদের অনেক বড় রকমের স্ট্রোক হতে পারে। যেটা অনেক সময় মৃত্যুর কারণ হয়ে ওঠে। কেউ কেউ আবার ডিপ্রেশনের কারণে একটা অন্যরকম জগতে প্রবেশ করে অর্থাৎ ডার্ক সাইট বা অন্য জগৎ যেখানে সে সবসময় একাকীত্ব ভালবাসে সে তাকে বিভোর ধ্যান ধারণা বা চিন্তা-ভাবনা যেটার সাথে বাস্তবের কোন রকমের কোন সামঞ্জস্য নেই। সে শুরু করে সিগারেট মদ গাঞ্জা হেরোইন সেবন করা 

এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে প্রতিবছর দুশ্চিন্তায় পড়ে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে  ৭৫% এর মাথাব্যথা হয়ে থাকে। যেটা আস্তে আস্তে ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে একটা সময় ঔষধের দ্বারা কাজ হয়না। হালকা মাথাব্যথা থেকে শুরু করে মাইগ্রেন,মস্তিষ্কে রক্তনালীর রোগ, মাথায় আঘাত, উচ্চ রক্তচাপ (হাই প্রেসার) টিউমার এর মতো ভয়ঙ্কর সব রোগের দেখা মিলে দুশ্চিন্তা কিংবা ডিপ্রেশন থেকেই।

দুশ্চিন্তা কিংবা ডিপ্রেশন থেকে কিভাবে আমরা বাঁচতে পারবো সে সম্পর্কে অনেকে অনেক রকমের টিপস দিয়ে থাকেন। কিন্তু আদৌ এইসব টিপস অনেক সময় কাজে দেয় না। নিম্নোক্ত টিপসগুলো যদি আপনি ফলো করেন তাহলে আশা করা যায় আপনার দুশ্চিন্তা কিছুটা হলেও কমবে।

১. ধর্মের আদেশ-নিষেধ মেনে চলুন।

 সর্ব প্রথমে আমি যেই টিপসটি দিব সেটা হচ্ছে আপনি আপনার ধর্মের পথে অগ্রসর হোন। কারণ প্রতিটি ধর্মের স্ট্রাকচারটা এইরকম যে আপনি সব সময় ধর্মের নিয়ম কানুন নীতি নৈতিকতা এবং আদর্শ গ্রহণ করবেন যদি আপনি আপনার ধর্মের পথ থেকে ছিটকে যান তাহলে আপনি ভাববেন আপনি আপনার গার্জিয়ান হারালেন কারণ ধর্মের যেসব নির্দেশনা দেওয়া থাকে সেগুলো আপনি গ্রহণ করলে আমি মনে করি না আপনি আর দুশ্চিন্তা বা ডিপ্রেশনে থাকবেন। আমার ধর্মের আলোকে ( কারণ মহান রাব্বুল আলামিন আপনাকে দুনিয়াতে কি কারনে পাঠিয়েছেন? আপনার দায়িত্ববোধ কি? ইত্যাদি রেখে যদি আপনি আপনার ক্ষণস্থায়ী জীবনের দুশ্চিন্তায় ভোগেন তাহলে দোষটা আপনি কাকে দিবেন? তাই এখনই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া শুরু করে দিন(মিনিমাম আপনার 24 ঘন্টার জীবনে আপনি ১.৫-২ ঘন্টা আল্লাহকে ডাকলেন এবং চিন্তা করলেন), নবী রাসুলের জীবনী,ইসলামের ইতিহাস মূলক বই গুলো পড়লে আপনাকে অনেক ছোট এবং পাপী বান্দা মনে হবে।

২. পরিবার-পরিজনের সাথে সব সময় হাসিখুশি এবং গল্প করে কাটান। 

সবচেয়ে ভালো হয় পরিবারের সবাইকে নিয়ে ভালো কোন জায়গায় ট্যুরে যান সেটা হতে পারে কোন প্রকৃতি বা মহান রাব্বুল আলামিনের সৃষ্টির অপরূপ সৌন্দর্যের দৃশ্য। কারণ, আপনি যখন পরিবারের সাথে সময় কাটাবেন তখন আপনি অন্য কিছুর চিন্তা ভাবনা থেকে নিজের মনকে দূরে রাখবেন আর সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে প্রকৃতি দেখলে আপনার মনটা ফুরফুরে হয়ে উঠবে এবং মনে অন্য রকমের আনন্দ বইবে।

৩. ডিপ্রেশন বা হতাশা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করুন। 

এটার মানে হচ্ছে আপনার আশেপাশে এমন কোন কিছু রাখবেন না যেটা আপনাকে হতাশা বা দুশ্চিন্তা মনে করিয়ে দেয়। সেটা হতে পারে কোন মিউজিক আপনার আশেপাশের বন্ধুদের স্টোরি, দামি দামি দালানকোঠায় মূল্যবান জিনিস এর হারানোর ভয়, প্রিয়জন নিয়ে খারাপ চিন্তা ভাবনা, ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তা ভাবনা, আপনার কোন রোগ হলে আপনি শিফা না চেয়ে দুশ্চিন্তা করতেছেন। আপনার ফ্রেন্ডের একটা দামি মোবাইল ফোন কিংবা বাইসাইকেল রয়েছে আপনার কেন নাই আপনি আপনার মা-বাবার কাছে আবদার করলেন আপনার মা-বাবা দিল না আপনি দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন তাই নিজেকে সব সময় এই সব বিষয় বস্তু থেকে দূরে রাখতে পারলে অর্থাৎ সর্বোপরি আপনি আলহামদুলিল্লাহ বলে এসব জিনিস থেকে সরে আসবেন।

৪. মৃত্যুর কথা চিন্তা করুন।

নিজের মৃত্যুকে চিন্তা করলে আপনার মধ্যে দুশ্চিন্তার কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে না। কারণ পৃথিবীতে অনেক সফল ধনাঢ্য ব্যক্তি যাদের কোটি টাকার গাড়ি-বাড়ি, খ্যাতি, সুনাম, যশ সবকিছুই ছিল তার পরেও তাদের একদিন এই পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে। আপনি কিসের এত চিন্তা ভাবনা করেন ভাই? কিসের এত আপনার দুশ্চিন্তা?  আপনার টাকা-পয়সা,ঘরবাড়ি সবকিছুই আপনি একদিন হারাবেন। আজ আপনি 2 লক্ষ টাকা হারালেন 2 লক্ষ টাকা জীবনে কোন কিছুই না ভাই এটা স্রেফ আপনাকে আনন্দ দিবে, কিংবা আপনারা আজ ব্রেকআপ হয়েছে ( হয়ত সে আপনার কাছে অনুপযুক্ত ছিল। কিন্তু মহান রাব্বুল আলামিন আপনার জন্য আরো ভাল কাউকে রেখে দিয়েছেন আপনি অপেক্ষা করুন আপনি আরো ভালো কাউকে পেয়ে যাবেন) কিংবা আজ আপনার এমন ধরনের অসুখ হয়েছে যার কারণে আপনি দুশ্চিন্তা করতেছেন আপনাকে তো একদিন মারা যেতেই হবে সেটা আজ হোক বা কাল হোক তাই জীবনে এমন কিছু নিয়ে চিন্তাভাবনা করবেন না যেটা আপনার মারা যাওয়ার পর কাজে দিবে না। পারলে পরকালের পাথেয় সংগ্রহ করুন।

নতুন সিস্টেমে কীভাবে ট্রেনের টিকিট কিনতে হয় তা জানতে এই নিবন্ধটি পড়ুন!

৫. নিজের যত্ন নিন।

মহান রাব্বুল আলামিন আপনাকে যে মূল্যবান সম্পদ দিয়েছেন সেটা হচ্ছে আপনার পুরো শরীর। আপনার মাথা থেকে পা পর্যন্ত সব সময় যত্ন নিবেন। যত দ্রুত সম্ভব তাড়াতাড়ি রাত্রে ঘুমাতে যাবেন কারণ রিসার্চে দেখা গিয়েছে, রাত যত গভীর হতে থাকে হতাশা এবং দুশ্চিন্তা কারী ব্যাক্তিরা ততবেশি  দুশ্চিন্তা করতে শুরু করে এবং এই সময় ভয়ঙ্কর সময় হতে থাকে। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে যাবেন কারণ আপনি সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে গেলে আপনার মনটা তাজা এবং ফুরফুরে থাকবে এবং আপনার সারাদিন ভালো কাটবে। সব সময় পবিত্রতা অর্জন করবেন। নিয়মিত গোসল করা খাওয়া দাওয়া করা এগুলা থেকে কোন একটি যদি আপনি বাদ দিয়ে থাকেন তাহলে আপনার মধ্যে কিছুটা হলেও চিন্তাভাবনা শুরু হতে থাকবে।

৬. অ্যালকোহল, হিরোইন,গাঞ্জা ও সিগারেট কে না বলুন!

দুশ্চিন্তা বা ডিপ্রেশনের থাকলে সবাই যে অপরাধ বেশি করে থাকে সেটা হচ্ছে অ্যালকোহল হিরোইন গাঞ্জা সিগারেট ইত্যাদি সেবন করা। একদিকে ইসলামে যেমন এইসব বিষয় হারাম অন্যদিকে আপনার শরীরের জন্য এইসব জিনিস অনেক বেশি ক্ষতিকর। আমি এটা চিন্তা করে পারিনা মানুষ দুশ্চিন্তা করে আবার দুশ্চিন্তা বাড়াতে চায় অর্থাৎ সে দুশ্চিন্তাকে ফিড দিচ্ছে এসব হারাম জিনিস সেবন করে। এক্ষেত্রে, আমার উপদেশ থাকবে আপনি ভিটামিন জাতীয় খাবার গুলো বেশি পরিমাণে গ্রহণ করবেন। বেশি করে পানি পান করবেন এবং চেষ্টা করবেন ব্যায়াম করে আপনার শরীরকে সুস্থ এবং সবল রাখার এছাড়া ভিটামিন জাতীয় খাবার বা ব্যায়াম করে দেহের রোগ প্রতিরোধক ব্যবস্থা শক্তিশালী করে তুলতে।

৭. সবসময় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন।

শুধুমাত্র দুশ্চিন্তা নয় সাধারণ চিন্তাভাবনাই আপনাকে দুশ্চিন্তা করে তুলবে। অতিরিক্ত চিন্তা করা থেকে নিজেকে সবসময় দূরে রাখবেন সবসময় যে কোন বিষয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে আপনি হয়তো কোন একটা জিনিস কিনতে গিয়ে আপনার পছন্দসই কিনতে পারলেন না কিংবা আপনি ঠকে গেলেন তার পরেও আপনি আপনার মনকে বুঝবেন যে আপনি জিনিসটা কিনতে পেরেছেন এবং আপনি জিতেছেন আপনি আলহামদুলিল্লাহ বলুন এভাবে নানা রকম ভাবে আপনি নিজেকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করাতে পারবেন যেটা আপনাকে দুশ্চিন্তা থেকে বাঁচিয়ে রাখবে।

৮. আপনার পছন্দের জিনিসটি করুন।

আমাদের ব্যক্তিগতভাবে অনেক রকমের পছন্দের জিনিস রয়েছে কেউ পছন্দ করে একটা খাবার খেতে কেউ আবার ক্রিকেট খেলতে আবার কেউ কেউ গার্ডেনিং করতে। অর্থাৎ বিষয়টা হচ্ছে আপনার ফ্রি সময়ে এসব জিনিসে যদি আপনি সময় দেন তাহলে আপনি চিন্তা ভাবনা থেকে মুক্ত থাকবেন আপনার চিন্তা করার সময় থাকবে না।

৯. সব সময় হাসি খুশি থাকবেন


keep smiling to-get-out-of-depression

সব সময় চেষ্টা করবেন হাসিখুশি থাকতে কারণ আমরা যখন হাসিখুশি থাকি তখন আমাদের মন অন্য কিছু নিয়ে চিন্তা ভাবনা করে না। যাদের দুশ্চিন্তার সমস্যা রয়েছে তাদের মধ্যে অনেকে হয়তো হাসি খুশি থাকে না যার ফলে স্ট্রোকের মত বড় বড় রোগের সৃষ্টি হয় তাই সবসময় চেষ্টা করব নিজেকে রিওয়ার্ড দিয়ে হাসিখুশি রাখার এবং চেষ্টা করবেন অন্যকে সাহায্য করতে যার ফলে আপনি হাসিখুশি থাকতে পারবেন।

১০. আপনার সমস্যাটি আপনার পরিবার কিংবা বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন।

একটা রিসার্চে দেখা গিয়েছে আমাদের মনের মধ্যে কোনো কথা চাপিয়ে রাখলে সেটা একটা সময় অনেক বড় রকমের সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে যেটা হতে পারে দুশ্চিন্তা কিংবা হতাশা। তাই আপনি কোন রকমের সমস্যা বা চিন্তা-ভাবনা করলে অবশ্যই সেটা আপনার পরিবার কিংবা বন্ধুদের সাথে শেয়ার করে মনকে হালকা রাখার চেষ্টা করবেন এবং পজিটিভ চিন্তাভাবনা করবেন। দেখবেন আপনার সমস্যাটি সমাধানের কোনো না কোনো রাস্তা আপনি পেয়ে যাবেন‌। কারণ আজ পর্যন্ত যতটুকু সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে প্রত্যেকটি সমস্যার একটা না একটা সমাধান রয়েছে আপনি একটা সমাধান না পেলে বিকল্প রাস্তা   আরেকটি সমাধান দেখতে পারেন।

ইনশাল্লাহ মহান রাব্বুল আলামিন আপনাকে হতাশা দুশ্চিন্তা থেকে খুব শীঘ্রই শিফা দান করবেন এবং সবসময় মহান রাব্বুল আলামিনের শুকরিয়া আদায় করুন এবং উনার কাছে দুই হাত তুলে দোয়া করুন এবং উনার উপর ভরসা রাখুন। আল্লাহ হাফেজ